প্রবন্ধ ১

By: Samrat Sarkar

Jan 17 2019

Category: Article

Leave a comment

“যে পাখি দুপুর, যে পাখি তাতার”

সম্রাট সরকার

আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে একটি বাংলা দৈনিক সংবাদপত্রে তার নাম ছেপে বেরিয়েছিলো। নবি নুর মোল্লা। আজ আর কেউ চেনে না তাকে। মনেও রাখেনি। হত-দরিদ্র মানুষ। অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে সে খাঁচায় বন্দি পাখি কিনত। তারপর? বাড়ি এসে উড়িয়ে দিত তাদের খাঁচা খুলে। পাড়া-প্রতিবেশী বলত ‘পাগল’। বলত ‘আদিখ্যেতা’। নবি নুর তার পাগলামো থামায়নি। খবরটির প্রভাবও তক্ষুনি ফুরিয়ে যায়নি। নব্বই-এর দশক ও তার পরবর্তি সময়ে খবরের কাগজের এমন ভিন্নগতের খবরের ভিত্তিতে কিছু গান তৈরি হয়েছে। কবীর সুমনের ‘সুহৃদ গঙ্গোপাধ্যায়’ বা ‘সঞ্জীব পুরোহিত’ সে রকম গান। এই গানগুলো বাঙালী শুনেছে। ঘটনা নিয়ে চর্চা করেছে। তো নবি নুর-কে নিয়েও লেখা হয়েছিলো। গান নয়। একখানি কবিতা। লিখেছিলেন কবি জয়দীপ ঘোষ। কবিতার নাম ‘উড়ান’। কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিলো একটি জনপ্রিয় বাংলা ম্যাগাজিনে। জয়দীপ শুরু করছেন এভাবে –

“অদুরে মেঘ, আকাশে পাতা মেঘ/ মেঘের বুকে লুটিয়ে মরে পাখি/ পাখিরও আজ মৃত্যু – অহংকার../ পাগল, তোকে কী বলে আর ডাকি!”

… তারপর আরো এগিয়েছেন সহজ ছন্দে।

“তোর বুঝি নীল দুঃখ আগোছালো?/ তোর শরীরে ভাটিয়ালি গান?/ কখনও মন খারাপ হলে তোর/ বৃষ্টি ঝরান মেঘলা ভগবান?”

কবিতা শেষ করছেন এভাবে –

“আমারও মন খারাপ বড় আজ/ দূরে কোথাও – দূরে কোথাও, দূর/ অসহ্য এই খাঁচার থেকে নিয়ে/ উড়িয়ে দিবি আমায় নবি নুর?”

কবি জয়দীপ নিজেও উড়তে চেয়েছেন নবি নুরের হাত ধরে। আসলে নবি নুরও উড়তে চেয়েছেন। পারেননি। আটকা পড়েছেন। আবহমান কাল ধরে যা নির্মম সত্যি। তাই পাখিদের উড়িয়ে নিজেকে দেখতে চেয়েছেন মুক্ত। সীমানা ভাঙার স্বপ্ন দেখেছেন। পাখির উড়ান সেই সীমানা মোছার প্রতীক। তাই খাঁচা খুলে পাখিদের ঠাই দিয়েছেন ‘মেঘের বুকে’।

কবি জয়দীপ ঘোষের আর কোনো কবিতা আমি পড়িনি। পড়ার দরকারও পড়েনি। তার একটি কবিতাই আমার গোটা জীবনের জন্য অনেক। যে কবিতায় নবি নুরের হাত ধরে উড়ান দিয়েছে পাখি।

কেমন আটকা পড়ি আমরা? পরিবার, সমাজ, রুজি-রুটি, ভালো ভাবে বাঁচতে চাওয়ার চেনা ছকে ফেঁসে? কবি ভাস্কর চক্রবর্তী লিখছেন –

“হাওয়া বাতাসের রাত…/ তোমার নিষিদ্ধ মুখ অস্বাভাবিক আছে ভেসে।/ কালোজিরে ধনেপাতা নিয়ে/ হয়তো-বা ফেঁসে গেছো খুব।/ আমিও ফেঁসেছি প্রায় ঐরকম/ ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনতে পাও তুমি?”

কবিতার নাম ‘ষাটের দশকের প্রেমিকাকে’। কাব্যগ্রন্থ ‘তুমি আমার ঘুম’। কবি ভাস্কর একভাবে আটকে পড়ার কথা বলেছেন। আজন্মকালের বেদখল হয়ে যাওয়া প্রেমের আলতো টান। শুধু তাই! বিষয়-আশয়, আত্মীয়-স্বজন, অর্জন – দখলদারির ফাঁস ছিন্ন করতে গিয়ে কেউ জড়িয়ে পড়েছেন ঈশ্বর-চিন্তায় তো কেউ আটকা পড়েছেন বিপ্লবী তত্ত্বকথায়। উপলদ্ধির ‘দ্বিধা থরো থরো চূড়ে’ দাঁড়িয়ে বারবার খুঁজতে চেয়েছে মুক্তির উপায়। এরমধ্যে দিয়ে জেনে, না জেনে এই সুন্দর পৃথিবীর সঙ্গে মানুষ তার সম্পর্ক ভিন্ন-ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আবিষ্কার করেছে। সমাজ এগিয়েছে। সে এক রুদ্ধশ্বাস অভিযান। অমসৃন, উথাল-পাতাল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দেখি এই ‘মনোমুগ্ধকর দূর্বিপাক’ (কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত-কে মনে রেখে)। এই দ্বৈরথকে সঙ্গী করে আবর্তিত হয়েছে বিশ্ব-রাজনীতি, হাই-ফাই ফান্ডা, অর্থনীতি, যুদ্ধ, সৃষ্টি, ধ্বংস, মৃত্যু, বিলুপ্তি। এইসব জীবনবোধ, বিশ্ব-চিন্তা হল সাহিত্যসৃষ্টির উৎসমুখ। কবি রাম বসু যেমন লিখেছেন –

“ অনুগত থেকো/ অনাবৃত জীবনের কাছে/ শক্তি নয়, সঙ্ঘ নয়, রাষ্ট্র নয়, খ্যাতি প্রতিপত্তি নয়/ জীবন, মানুষ, রূপ/ দীনতা বিনয়ে/ বিশ্বকে নিজের মধ্যে টেনে নিয়ে বিশ্ব হয়ে যেয়ো”

তাতেও কি মুক্তি? কেউ নিশ্চিত নয়। তাই আপাত অর্থে মুক্তি বলে কিছু হয়ও না। আর মুক্তির উপমা হিসেবে যে প্রাণিটিকে সবচেয়ে নিকটের মনে হয় সেই পাখিদের জীবন? তাদের মুক্তি?

পৃথিবীতে কিছু পাখি আছে যারা সেই অর্থে সংসারী। জলাশয়ের পাখি ‘চখাচখি’ বা ‘রাডি শেল্‌ডাক’ বহু বছর সঙ্গী বা সঙ্গিনীকে ধরে রাখে। প্রজননের সময় এবং শীতকালীন প্রবাসেও। সম্পর্কে কোন রসায়ন কাজ করে তাদের! জানিনা। আবার কেউ কেউ দলবেঁধে থাকে। দলের প্রয়োজনে খাবার খোঁজে, সম্পর্ক জোরদার করতে একে অন্যের পালক পরিষ্কার করে দেয় (পক্ষীবিদ্যার ভাষায় ‘অ্যালোপ্রিনিং’), অন্তত যতক্ষণ সে ঐ’দলে আছে। উদাহরণ বাংলার পরিচিত পাখি ছাতারে, মুনিয়া। যদি আসি প্রজনন বা ডিম পাড়া বা সন্তান উৎপাদন-পালনের কথায়, অনেক পাখি কিন্তু একটা স্তর পর্যন্ত ভালো পিতা-মাতা। যদিও সন্তান শিক্ষিত হবে, মানুষ হবে, থুড়ি পাখি হবে বা বুড়োবয়েসে তাদের দেখভাল করবে এই আশায় নয়! কিছুটা যান্ত্রিক হলেও এসব তাদের নিজস্ব, অন্তর্গত বন্ধন। আটকে পড়া। এর উল্টো পিঠ কি নেই? আছে। পাখি তাদের বাচ্চারা উড়তে আর খেতে শিখলেই খেদিয়ে দেয়। বিচ্ছিন্ন করে। ট্রিট করে এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকা অন্য স্বজাতি হিসেবে। এক ইঞ্চি বেশিও নয় এক ইঞ্চি কমও নয়। সম্পর্কের দায় অপ্রাসঙ্গিক। কোনো স্ত্রী-পাখি আবার ডিম পাড়ার পর ঘুরেও দেখেনা বাচ্চা হলো কি হলোনা। পুরুষটি ডিম ফোঁটায়, বাচ্চা বড় করে। বাংলার ঘাসজমির পাখি ‘বাটন্‌-কোয়েল’ তার উদাহরণ। তাহলে পাখিদের জীবন কি সন্ন্যাসের জীবনের কাছাকাছি? অন্তত আমার কাছে তাই। সন্তানের টান আছে, আবার নেই। খেয়াল করে দেখবেন, বাসা আক্রান্ত হলে কিছুক্ষণ প্রতিরোধ করবে, চিৎকার করবে। তারপরও যদি না এঁটে ওঠে? থাকলো তোমার বাসা আর বাচ্চা। আগে নিজের প্রাণ। পরদিনই সব ভুলে সুরেলা গলায় গান গেয়ে নতুন ভোরকে স্বাগত জানাতে থাকবে। ভেসে যাওয়া সাধের সংসার নিমেষে অতীত। বড় ঈগলদের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়, খাবার দুর্লভ হয়ে পড়লে স্বাস্থ্যবান বাচ্চাটিকে বেশি খাবার দিতে থাকে মায়েরা। কারণ তার বাঁচার সম্ভাবনা বেশি। দুর্বলটি মরে মরুক।

হ্যাঁ, প্রাজাতির টিকে থাকাই একমাত্র শর্ত। তার মধ্যে দিয়ে যেটুকু দায়, সেটুকুই। আর তার যুক্তিগ্রাহ্য কারনও রয়েছে। পাখির মস্তিষ্কের সঙ্গে মানুষের মস্তিষ্কের কোনো তুলনাই চলে না। তাদের আবেগ, চিন্তাশক্তি, সৃষ্টিশীলতা কোথায়? কিন্তু এই সুন্দর পৃথিবীর কোনো মুহূর্তই কি তাদের নাড়া দেয় না!

গবেষণা বলছে অরণ্যে সবমিলিয়ে প্রধানত পাঁচ রকমের আলোর খেলা চলে। ১)হলদে-সবুজ, ২)নীলচে-ধূসর, ৩)কমলা-লাল, ৪)বেগুনি-নীল ও ৫)সাদা। এই আলোর খেলা নির্ভর করে মূলত অরণ্যের গঠন (জিওমেট্রি), আকাশে মেঘের উপস্থিতি ও সূর্যের কৌণিক অবস্থানের ওপর। সাধারন বনাঞ্চলে নীলচে-ধূসর আলো, জঙ্গলের মধ্যে কিছুটা ফাঁক থাকলে সেখানে কমলা-লাল, বিস্তর ফাঁক থাকলে ম্যাড়ম্যাড়ে সাদা আলো (সে আকাশে মেঘ থাক আর না থাক), খুব ভোরবেলা বা সন্ধ্যেবেলা বেগুনি-নীল এবং ছাদ ঢাকা বনাঞ্চলে হলদে-সবুজ আলোয় ঢেকে যায়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জন এ. এন্ডলার ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত তার গবেষণা পত্রে দেখান এই চমকপ্রদ তথ্য। তিনি আরো দেখিয়েছেন এই আলোর খেলা বনাঞ্চলে উপস্থিত গাছের প্রকারভেদ, জঙ্গলের উচ্চতা বা জঙ্গলটি কোন মহাদেশে অবস্থিত – তার ওপর নির্ভর করে না।

এতো গেলো আলোর কারসাজির কথা। পাখির ওপর কি সেই আলোর কোনো প্রভাব আছে? এন্ডলার সাহেব বলছেন আছে। কি রকমের প্রভাব?

আগেই বলেছি, অরণ্যে দিনের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের আলোর পরিবেশ (স্পেকট্রাল এনভায়রনমেন্ট) তৈরি করে। অনেক পাখি তার প্রজননসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিজের দেহের পালকের রঙ-কে বিভিন্ন ভাবে প্রদর্শন (পক্ষীবিদ্যার ভাষায় ‘ডিসপ্লে’) করে। তাদের পালকের সেই রঙ ভিন্ন ভিন্ন আলোর পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রতিভাত হয়। চারপাশের আলোয় সেই রঙের বর্ণচ্ছটা (রিফ্লেকট্যান্স স্পেকট্রা) সঙ্গী বা সঙ্গীনিকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। তাই ঘুরিয়ে বললে, প্রজননগত সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে জঙ্গলের গঠন, আকাশে মেঘের উপস্থিতি ও সূর্যের কৌণিক অবস্থানের ওপর, বিশেষ করে সেই সব পাখিদের যারা প্রজননের সময় পার্টনারকে প্রদর্শনে (ডিসপ্লে) অভ্যস্থ। ঠিক এই কথাটাই গবেষক এন্ডলার ও মার্ক থেরি ১৯৯৫ সালে তাদের আরেকটি গবেষণা পত্রে দেখান। তাই পাখি যতই নেচে-কুঁদে তার রঙ-বেরঙের পালক উল্টোদিকের পার্টনারকে দেখাতে চাক না কেনো তার দেহের ওপর নাটকীয় আলো না পড়লে সব বৃথা। তাহলে এ অনুমান কি অমূলক যে জঙ্গলে আলোর খেলা পাখিদের আবেগপ্রবন করে তোলে? চকিতে, ক্ষণিকের তরে পার্টনারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে? অবশ্য সফল বংশবিস্তারের অব্যবহিত পর সবশেষ। আর অসফল হলে? তাতেই বা কি যায় আসে! পরের বার আবার, চকিতে, ক্ষণিকের তরে..

এও তো আটকে পড়া। কিন্তু ওই যে বলেছি, প্রাজাতির টিঁকে থাকাই প্রাধান। তারপর এক নির্লিপ্ত, কঠিন-শীতল জীবনযাপন। সম্পর্ক, সম্পদ, মালিকানা ভালো-মন্দ ইত্যাদি থেকে যথাযথ উদাসীন এক বিশ্বনাগরিক। ভালোবাসা, ক্রোধ ইত্যাদির ঊর্ধে, শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে বারবার তার নিজস্ব পৃথিবীর নির্মান-বিনির্মানের কারিগর। তাদের এই ফিলোজফি আমার কাছে মুক্তির প্রতীক। শুধু ডানা মেলে ওড়া নয়।

অতঃপর আমি আমার প্রিয় কবি রণজিৎ দাশের কবিতায় ডুবে যাই। আটকা পড়ি। ‘ভোর’ নামের কবিতায় তিলি লেখেন –

“চড়ুইপাখির ঝগড়াটে সংসারে/ অতিথি সূর্য, কুয়াশা বিলীয়মান;/ বৃদ্ধ আকাশ খড়কুটো হাতে, দ্বারে/ ছটফটে কিছু স্বপ্নকে সামলান”

ভোর, সূর্য, স্বপ্ন, এই ভোরের আকাশ সবার। আমাদেরও, আবার পাখিদেরও। স্বপ্ন দেখি তারা উড়ে বেড়ায় যেন চিরকাল, খাঁচার আগল খুলে – আকাশে, আবেগে। বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে তাদের উড়ান। প্রেমে-অপ্রেমে, মুক্তির উপমায় উজ্জ্বল। ভোর নিঃশব্দে দুপুরে গড়ায়। “পাখি খুলে” দেন কবি রণজিৎদাশ। লিখে ফেলেন –

“ এই তো সময়, উপহার আনো – / জিহ্বাতরল জলরাশি, ক্ষার,/ খোলা কঙ্কণ, অস্ফুটগলা,/ এবং তোমার ভিতর-শরীর/ বলেছি, তোমাকে পাখি খুলে দেবো – / যে পাখি দুপুর, যে পাখি তাতার”।

Advertisements